আবহাওয়া বিশ্বঘড়ি মুদ্রাবাজার বাংলা দেখা না গেলে                    
শিরোনাম :
উবার ও পাঠাও-এর মতো অ্যাপ নির্ভর পরিবহন সেবা বন্ধের দাবীতে মিরপুরস্থ বিআরটিএ কার্যালয় ঘেরাও      ব্র্যাকসহ ২০টি আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে পাকিস্তান ছাড়তে ৬০ দিনের আল্টিমেটাম      ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ সড়কে তীব্র যানজট: ২০ কিলোমিটার জট      এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৬ হাজার মেগাওয়াট : প্রধানমন্ত্রী      সরকারের ঘোষনা ডিসেম্বর থেকে দাম বৃদ্ধি: নভেম্বর থেকেই নেওয়া হচ্ছে বাড়তি বিদ্যুতের বিল!      র‌্যাব রীতিমতো ছোটখাটো যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে আমাকে তাদের গাড়িতে ওঠায়: ফরহাদ মজহার      থানা চত্ত্বরে ৬ মাসের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামীকে মঞ্চে নিয়ে এমপি রতনের সমাবেশ!      
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : বাঙালি জাতির মুখবন্ধ
অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
Published : Tuesday, 14 November, 2017 at 4:59 PM
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : বাঙালি জাতির মুখবন্ধবঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার সংগ্রাম কথাটা বলেই ক্ষান্ত হননি, মুক্তির সংগ্রামের কথাটাও যোগ করেছিলেন। যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বঙ্গবন্ধুর মনে মুক্তির সংগ্রামের তাৎপর্য লুকানো ছিল
বঙ্গবন্ধু আজীবন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বক্তৃতা দিতেন। কারও লিখিত বক্তৃতা তিনি পড়তে পারতেন না, পড়েনওনি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ লিখিত হতো না। সমাজবিজ্ঞানী সরদার ফজলুল করিমের ভাষায়Ñ ‘শেখ মুজিবের ভাষণ যেমন লিখিত হতো না, তেমনি তার প্রদত্ত ভাষণকে লেখা যেত না।’ ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে এরই মধ্যে অসংখ্য লেখা বেরিয়েছে। একাধিক বই রচনা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পৃথিবীর সেরা ভাষণের একটি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ‘মেমোরি অব দি ওয়ার্ল্ড’ এর স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। সোমবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এক ঘোষণায় এ কথা জানান। 
Jakob F. Fieldসম্পাদিত ÔWe Shall Fight on the Beaches : The Speeches that Inspired HistoryÕ শীর্ষক গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ অব্দ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণের মধ্যে স্থান পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিলের ভাষণ থেকে এ বইয়ের শিরোনাম করা হয়েছে। এ বইয়ে শেষ ভাষণটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের (টিয়ার্স ডাউন ওয়াল)। ২২৩ পৃষ্ঠার বইটির ২০১ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ‘দ্য স্ট্রাগল দিস টাইম ইজ দ্য স্ট্রাগল ফর ইনডিপেনডেন্স’ শিরোনামে মহাকালের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, ৭ মার্চের ভাষণের ওপর সব লেখা, বই, এমনকি ভাষণটি বারবার পড়লেও ভাষণের তাৎপর্য অনুধাবন করা যায়; কিন্তু সত্যিকারের বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যায় না। ধরা যাক, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি আগেই লিখিত ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ভাষায়, ‘সেদিন আব্বার একটু সর্দি ছিল। আমি গলায়-কপালে ভিক্স মালিশ করে দিলাম। কাঁথাটা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকলেন।’ কল্পনা করা যাক, বঙ্গবন্ধুর সর্দি আরও বেড়ে গেল, জ্বর এলো, গলার স্বর একেবারে বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বঙ্গবন্ধু কোনো অবস্থায়ই উত্তাল রেসকোর্সে হাজির হতে পারলেন না। তিনি লিখিত ভাষণটি পাঠিয়ে দিলেন এবং কাউকে দিয়ে পাঠ করাতে বললেন। কেমন হতো যদি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কেউ তার বক্তৃতাটি পড়ত? বঙ্গবন্ধু ছাড়া ৭ মার্চের ভাষণ চিন্তাই করা যায় না। বঙ্গবন্ধুর মতো করে কে বলতে পারত ‘ভাইয়েরা আমার’। পৃথিবীর ইতিহাসে সেরা ভাষণ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে ইতিহাসের নির্দিষ্ট সে মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি এবং স্বকণ্ঠে এ ভাষণ উচ্চারণের অপরিহার্যতা। ১৯ নভেম্বর ১৮৬৩ সালে গেটিসবার্গে লিংকন না গেলেও অনুষ্ঠানটি হতো। কারণ লিংকন সেদিন অসুস্থ ছিলেন এবং মূল বক্তাও ছিলেন না। আমেরিকার গৃহযুদ্ধে নিহত ইউনিয়নপন্থী সৈনিকদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে মূল বক্তা ছিলেন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড এভারেট। এভারেটের ২ ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতার পর মাত্র ২ মিনিটে বিখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণ দেন লিংকন। ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ বক্তৃতা যখন ২৮ আগস্ট ১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিং দেন, সে অনুষ্ঠানেও লুথার কিং ছিলেন অনুষ্ঠানের অনেক বক্তার একজন। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের সমঅধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী আরও ২০টি সংগঠনের নেতার সঙ্গে কিং তার বক্তৃতা করেন। বক্তৃতাটি ছিল লিখিত। তবে বক্তৃতার শেষের দিকে বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী মাহালিয়া জ্যাকসনের অনুরোধে বক্তৃতা বাড়িয়ে আমেরিকাকে নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলেন। উইনস্টন চার্চিলের ৪ জুন ১৯৪০ সালের ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস’ বক্তৃতাটিও অন্য কেউ দিলে চলত। ১০ মে ১৯৪০ কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ব্রিটিশ কমনসসভায় একই বিষয়ে ১৯৪০ সালের ১৩ মে থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত চারটি ভাষণ দেন চার্চিল। কিন্তু ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল ইতিহাসের অনিবার্যতা। বঙ্গবন্ধু হলেন প্রখ্যাত মনীষী এস ওয়াজেদ আলীর ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত ‘ভবিষ্যতের বাঙালি’ গ্রন্থের সে মহামানবÑ যার প্রতীক্ষায় ছিল বাঙালি, যিনি তাদের গৌরবময় জীবনের সন্ধান দেবেন। ১ মার্চ ঘোষণা করা হয়, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। ৭ মার্চ আসার আগেই ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। সরদার ফজলুল করিমের ভাষায়, ‘কোনো ব্যক্তি শূন্য থেকে এসে বলতে পারে না, আমি তোমাদের নেতা এবং তার বলা মাত্র অপর সবাই যথার্থভাবে অন্তর দিয়ে বলতে পারে না, হ্যাঁ আপনি আমাদের নেতা; একজন জবর নেতৃত্ব দখল কেবল অস্ত্রধারীর পক্ষেই সম্ভব, নিরস্ত্র সংগ্রামীর পক্ষে নয়।’ বঙ্গবন্ধু, যিনি ইতিহাসের স্রষ্টা এবং সৃষ্টি, তিনিই একটি চরণে বাঙালির ইতিহাস রচনা করতে পারেনÑ ‘বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’ একমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই বাঙালির ভবিষ্যৎ এক লাইনে রচনা সম্ভবÑ ‘৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ সেদিন রেসকোর্সের মাঠে দোভাষীর কাজ করছিলেন তখনকার ইংরেজি বিভাগের ছাত্র সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তাৎক্ষণিক ইংরেজি করে শোনাচ্ছিলেন এক বিদেশি সাংবাদিককে। প্রথম কিছু বাক্যের ইংরেজি অনুবাদ শোনানোর পর বিদেশি সাংবাদিক তাকে অনুবাদ করতে বারণ করলেনÑ যদিও ওই সাংবাদিক এক অক্ষর বাংলাও জানতেন না। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি সে সাংবাদিক মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। সৈয়দ মনজুরুলের ভাষায়Ñ ‘তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি প্রতিটি বাক্য বুঝছেন, যেন বঙ্গবন্ধু বাংলায় নয়, ইংরেজিতে ভাষণটি দিচ্ছেন।’ বিদেশি সাংবাদিক তার হোটেলে যাওয়ার আগে সৈয়দ মনজুরুল জিজ্ঞেস করেছিলেন, এ ভাষণের পর কী হতে পারে? বিদেশি সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘গেট রেডি।’ 
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার সংগ্রাম কথাটা বলেই ক্ষান্ত হননি, মুক্তির সংগ্রামের কথাটাও যোগ করেছিলেন। যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বঙ্গবন্ধুর মনে মুক্তির সংগ্রামের তাৎপর্য লুকানো ছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি একবার উচ্চারিত হলেও ‘মুক্তি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কয়েকবারÑ ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়’, ‘এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’, ‘যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হয়’, ‘এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশআল্লাহ’, সবশেষে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। স্বাধীনতার সংগ্রামের চেয়ে মুক্তির সংগ্রাম অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও স্বাধীনতা ছাড়া মুক্তির সংগ্রাম শুরুই করা যায় না। বিদেশি শাসনের অবসান হলেও মানুষ মুক্ত হয় না, যদি না মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি অর্জন করে। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ হয়। হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি প্রথম একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক হয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির পক্ষে দেশ যাত্রা শুরু করেছিল মাত্র। দেশের সে অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়া হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের পাতা ঘুরতে থাকে পেছনের দিকে। সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার চাকা এখনও থামানো যায়নি। গেল শতাব্দীর চল্লিশের দশকে আমরা আরও উদার ছিলাম। এত ধর্মান্ধ-কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল না সমাজ। অন্তত বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সংস্কারমুক্ত। অর্থনৈতিকভাবে আমরা দ্রুত এগোচ্ছি। ২০২১ সালে মাথাপিছু ডলারের হিসাবে আমরা বিশ্বব্যাংকের মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় স্থান পাব। ২০৪১ সালে হয়তো উন্নত দেশও হব। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা তার স্বপ্নের মতো হবে কি? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি, নন-বাঙালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে, আমাদের উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ আমরা সবাই মিলেমিশে একটি বহুমাত্রিক, বহুবাচনিক সমাজ বিনির্মাণ করতে পারব কিনা সেটা এখন থেকেই ভাবতে হবে। স্বাধীনতার চেয়ে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ মুক্তি। মুক্তি বলতে সব বঞ্চনা, বৈষম্য, শোষণ, সংকীর্ণতা, কূপম-ূকতা, চেতনার দীনতা থেকে মুক্তি বুঝিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আমাদের মুক্তির সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে মুক্তির সংগ্রাম কখনও শেষ হয় না; এটা চলে নিরন্তর। মানুষ অনবরত অধিকতর মুক্তির দিকে এগিয়ে চলে। 

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়







জাতীয় পাতার আরও খবর
আজকের রাশিচক্র
সম্পাদক : ইয়াসিন আহমেদ রিপন

ঝর্ণা মঞ্জিল, মাষ্টার পাড়া, মাইজদী, নোয়াখালী। ঢাকা: ৭৯/বি, এভিনিউ-১, ব্লক-বি, মিরপুর-১২, ঢাকা-১২২৬, বাংলাদেশ।
ফোন : +৮৮-০২-৯০১৫৫৬৬, মোবাইল : ০১৯১৫-৭৮৪২৬৪, ই-মেইল : info@bdhotnews.com